‘মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি’—মৃত্যুর আগে মুক্তার শেষ আকুতি
রাজধানীর খিলক্ষেতে গৃহবধূ মুক্তা ইসলামকে শিকল দিয়ে বেঁধে বেল্ট দিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে তাঁর স্বামী সোহেল শিকদারের বিরুদ্ধে। নির্যাতনের সময় পাশের কক্ষে থাকা দুই সন্তানের কান্না শুনে মুক্তা স্বামীর কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন—‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’ সেই হৃদয়বিদারক কথার ভিডিও এখন সামনে আসার পর ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুক্তার বয়স ছিল ২৫ বছর। তাঁর দুই সন্তান সাফওয়ান ও তাসফিয়ার বয়স যথাক্রমে পাঁচ ও চার বছর। নির্যাতনের সময় শিশুরা পাশের কক্ষে ছিল এবং মায়ের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় তারা কান্না করছিল বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
শিকলে বাঁধা অবস্থায় নির্যাতনের অভিযোগ
পুলিশের কাছে থাকা প্রায় তিন মিনিটের একটি ভিডিওতে মুক্তাকে খাটের সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিডিওতে তাঁর স্বামীকে বেল্ট দিয়ে মারধর করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে মুক্তা নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং স্বামীকে ভালোবাসেন বলেও বলতে শোনা যায়। এরপর সন্তানদের কান্না শুনে তাদের ঘুম পাড়ানোর সুযোগ চেয়ে আকুতি জানান তিনি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর ওই নির্যাতনের ভিডিওটি মুক্তার ভাই তানভীর রহমানের কাছে পাঠানো হয়েছিল। ভিডিওর সঙ্গে তাঁর বোনকে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল বলেও পুলিশ জানিয়েছে। পরে মুক্তার স্বজনেরা তাঁর খোঁজ নিতে গেলে তাঁকে আর জীবিত পাননি।
দুই দিন পর উদ্ধার হয় মরদেহ
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিডিও পাঠানোর দুই দিন পর খিলক্ষেতের বাসা থেকে মুক্তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের পর তাঁকে হত্যা করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও ময়নাতদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, সোহেল মুক্তাকে মারধরের কথা স্বীকার করলেও মৃত্যুর দিন তাঁকে মারধর করার কথা অস্বীকার করেছেন। মুক্তার মৃত্যু মারধরের কারণে হয়েছে, নাকি তিনি আত্মহত্যা করেছেন—ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার
মুক্তার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ভাই তানভীর রহমান খিলক্ষেত থানায় মামলা করেছেন। মামলায় মুক্তার স্বামীসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে মামলার প্রধান আসামি সোহেল শিকদারকে গ্রেপ্তার করেছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই মুক্তার ওপর নির্যাতন চলছিল। কয়েক মাস আগে সোহেল মুক্তার ভাইয়ের কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন এবং টাকা দিতে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে মুক্তাকে মারধর করা হতো বলেও স্বজনেরা দাবি করেছেন। পাশাপাশি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহ ও যৌতুকের অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অভিযোগেরও তদন্ত চলছে।
মায়ের জন্য কাঁদছে দুই শিশু
মুক্তার মৃত্যুর পর সবচেয়ে করুণ অবস্থায় পড়েছে তাঁর দুই সন্তান। মাত্র পাঁচ ও চার বছর বয়সী এই দুই শিশু এখনো হয়তো পুরোপুরি বুঝতে পারছে না কী ঘটেছে। যে সন্তানদের কান্না থামাতে নিজের ওপর চলা নির্যাতনের মধ্যেও মুক্তা স্বামীর কাছে তাদের ঘুম পাড়ানোর সুযোগ চেয়েছিলেন, সেই সন্তানরাই এখন মাকে হারিয়ে পড়েছে গভীর অনিশ্চয়তায়।
ঘটনাটি সামনে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এলাকাবাসী ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষী প্রমাণিত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
তবে মুক্তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কার কী ভূমিকা ছিল, তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে তদন্ত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া। অভিযোগ ও ভিডিওতে নির্যাতনের দৃশ্য থাকলেও আইনি দৃষ্টিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের মাধ্যমেই হবে।