সোহেলের বক্তব্য ঘিরে নতুন আলোচনা, ‘আমি একা করি নাই’ দাবির পেছনে আসলে কী?
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলাকে ঘিরে আবারও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানার আদালতে দেওয়া বক্তব্যের একটি অংশকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের দাবি ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ‘আমি একা করি নাই’—এমন বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে অনেক পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল।
তবে আদালতের নথি ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনা করলে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কারণ সোহেল রানা আদালতে এক পর্যায়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে অন্য একজনের নাম উল্লেখ করেন। পরে আবার নিজের দায় স্বীকার করে ক্ষমা চান। ফলে তার বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ নিয়ে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন উঠেছে।
আদালতে কী বলেছিলেন সোহেল?
২০২৬ সালের জুনে মামলার আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে সোহেল রানা প্রথমে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। এ সময় তিনি ‘ডলার’ নামে একজনকে ধরার কথা বলেন। পরে আবার তিনি বলেন, তিনি ভুল করেছেন এবং ক্ষমা চান। একই সঙ্গে নিজের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে নির্দোষ দাবি করেন।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পিপি আদালতে স্পষ্ট করেন, সোহেল রানার বক্তব্যে উল্লেখ করা ‘ডলার’ নামটি তদন্তের অভিযোগপত্রে নেই। ফলে ওই ব্যক্তি আদৌ কোনো ব্যক্তি কি না, নাকি অন্য কোনো কারণে এই নাম এসেছে—সেটিও যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে।
‘আরও কেউ ছিল’—দাবিটির সত্যতা কতটুকু?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোহেলের বক্তব্যের একটি অংশকে কেন্দ্র করে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে যেন তদন্তে ইতোমধ্যে প্রমাণ হয়েছে যে ঘটনার সময় আরও কয়েকজন সেখানে উপস্থিত ছিল। কিন্তু নির্ভরযোগ্য প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণের কথা নিশ্চিত করা হয়নি।
বরং রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে জানিয়েছে, ‘ডলার’ নামে কাউকে আসামি করা হয়নি এবং চার্জশিটেও তার নাম নেই। তাই শুধু একজন আসামির বক্তব্যের ভিত্তিতে অন্য কাউকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
মামলার বিচার কোথায় দাঁড়িয়ে?
এই মামলায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়েছে। পরে আদালতে একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। জুন ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের বিরুদ্ধে মোট ১০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছিল।
অর্থাৎ বিষয়টি এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। আদালতে কোনো আসামির বক্তব্য, অভিযোগ বা পাল্টা দাবি সামনে আসা মানেই সেটি চূড়ান্তভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। সাক্ষ্য, আলামত, তদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রমাণ বিবেচনা করেই আদালত শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।
নিহত শিশুর পরিবারের অভিযোগ
ঘটনার পর শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার দিন শিশুটিকে খুঁজতে গিয়ে তারা ভবনের বিভিন্ন দরজায় কড়া নাড়েন। পরে অভিযুক্ত সোহেলের বাসার দরজা নিয়েও তাদের সন্দেহ তৈরি হয়।
মামলার তদন্তে এসব বক্তব্য, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় এবং বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেন নতুন করে ভাইরাল?
পুরোনো কোনো মামলার আদালতকেন্দ্রিক বক্তব্যকে নতুন ঘটনার মতো করে প্রকাশ করা এবং শিরোনামের কিছু অংশ বাদ দিয়ে উপস্থাপন করার কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এই মামলাতেও ‘সোহেল একা করেনি’ ধরনের অসম্পূর্ণ বক্তব্য ব্যবহার করে বিভিন্ন পোস্ট তৈরি হয়েছে।
কিন্তু পুরো বক্তব্য দেখলে বোঝা যায়, আদালতে সোহেল প্রথমে ‘ডলার’ নামে একজনের কথা বললেও পরে নিজের দায়ের কথাও স্বীকার করেছেন। আর রাষ্ট্রপক্ষ ওই ‘ডলার’-এর অস্তিত্ব ও পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
শেষ কথা
তাই ‘অবশেষে সত্য ঘটনা বেরিয়ে এসেছে, সোহেল একা করেনি’—এভাবে বিষয়টিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা এখনই ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, সোহেল রানা আদালতে অন্য একজনের কথা উল্লেখ করেছিলেন এবং তার বক্তব্য নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে; তবে ওই ব্যক্তির সম্পৃক্ততা এখনো প্রমাণিত নয়।
মামলাটি বিচারাধীন হওয়ায় আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কারও বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রচার না করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ। বিশেষ করে শিশুটির পরিচয় ও পরিবারের গোপনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।