Dhaka , Tuesday, 21 July 2026
News Title :
একসঙ্গে মৃ*ত্যুর সিদ্ধান্ত, যমুনায় ঝাঁপ দিলেন প্রেমিক; শেষ মুহূর্তে সরে গেলেন প্রেমিকা…..see more আজ থেকে সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণ করল সরকার ৫ লিটার সয়াবিন তেল…See more কলেজ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক এর সাথে ও সামাজিক কর্মকান্ডের কারণে…see more মেয়েটি বাবা-মাকে স্কুলে যাওয়ার নাম ধরে ফাঁকি দিয়ে দেখা করতে আসতো তার নিজের আপন….. See more শরিয়তপুরের ডিসি সাহেব! কট খেয়েছে…see more নানুর বাড়ি যাবে বলে মেয়ে ঘর থেকে বের হয়েছিল মা নিজেও জানে না মেয়ে তার আপন…. See more কোন_ধরনের_নারীর_যৌ_ন_ক্ষুধা_বেশী…See more স্পেনের দুই ফুটবলারকে কেন আঘাত করেছিলেন পারেদেস, কী ঘটেছিল?……see more মেসির উম্মতেরা, আর্জেন্টিনার যে সকল সাপোর্টাররা মেসিকে নবীর সাথে….see more ফাইনালের স্পেনের পক্ষে গেছে ঠিকই, কিন্তু গোলপোস্টের নিচে এমিলিয়ানো… See more
News Title :
একসঙ্গে মৃ*ত্যুর সিদ্ধান্ত, যমুনায় ঝাঁপ দিলেন প্রেমিক; শেষ মুহূর্তে সরে গেলেন প্রেমিকা…..see more আজ থেকে সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণ করল সরকার ৫ লিটার সয়াবিন তেল…See more কলেজ শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক এর সাথে ও সামাজিক কর্মকান্ডের কারণে…see more মেয়েটি বাবা-মাকে স্কুলে যাওয়ার নাম ধরে ফাঁকি দিয়ে দেখা করতে আসতো তার নিজের আপন….. See more শরিয়তপুরের ডিসি সাহেব! কট খেয়েছে…see more নানুর বাড়ি যাবে বলে মেয়ে ঘর থেকে বের হয়েছিল মা নিজেও জানে না মেয়ে তার আপন…. See more কোন_ধরনের_নারীর_যৌ_ন_ক্ষুধা_বেশী…See more স্পেনের দুই ফুটবলারকে কেন আঘাত করেছিলেন পারেদেস, কী ঘটেছিল?……see more মেসির উম্মতেরা, আর্জেন্টিনার যে সকল সাপোর্টাররা মেসিকে নবীর সাথে….see more ফাইনালের স্পেনের পক্ষে গেছে ঠিকই, কিন্তু গোলপোস্টের নিচে এমিলিয়ানো… See more

পটুয়াখালীর এক বাড়িতে শুরু হওয়া এই ধ’স্তাধ’স্তির নেপথ্যে বেরিয়ে এলো..

  • Reporter Name
  • Update Time : 04:17 am, Thursday, 14 May 2026
  • 10273 Time View

বরিশাল বিভাগকে বলা হতো ‘বাংলার শস্যভান্ডার’ আর পটুয়াখালী তারই অংশ। জলবায়ু পরিবর্তন ধীরে ধীরে পটুয়াখালীকে দেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা বানিয়েছে; কিন্তু এখানেই শেষ নয়। পুরোনো প্রভাবের পাশাপাশি নতুন নতুন সমস্যার মুখে ফেলছে পটুয়াখালীর মানুষকে। ফলে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে জীবন-জীবিকা, ঝরে পড়ছে বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থী, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য। নারীরা পড়ছেন যৌনস্বাস্থ্যের জটিল সব সমস্যার মুখে। বাধ্য হয়ে জলবায়ু আর দারিদ্র্যের কাছে মানুষ অসহায় আত্মসমর্পণ করছে অথবা এলাকা ছাড়ছে।

ডিসেম্বরের হিম হিম সকাল। দোচালা টিনের ঘরের বারান্দায় কাঁথা-কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন এক বয়োজ্যেষ্ঠ। চরের সবাই তাঁকে একনামে চেনেন—মতলেব মল্লিক। প্রবীণ মতলেবের চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে শ্রম আর লড়াইয়ের চিহ্ন। একের পর এক ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করা মতলেবের চোখে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় গোর্কির স্মৃতি এখনো ভয় ধরায়। তিনি বলেন, ‘সে কি ভয়ংকর ঝড়। কোথাও মাটি দ্যাহা যায় না; ঘরবাড়ি দ্যাহা যায় না। চারদিক পানি আর পানি।’

গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চালিতাবুনিয়ায় মতলেব মল্লিকের সঙ্গে কথা হয়। ’৭০–এর ঘূর্ণিঝড়ে নারকেলগাছের আগায় লটকে বেঁচে ছিলেন মতলেব; কিন্তু পরদিন বাড়ি ফিরে দেখেন—মা, স্ত্রী, এক ছেলে ছাড়া আর কিছু নেই। তিনি বলেন, ‘মাইয়াডা নাই, বোনডাও নাই, ঘরবাড়ি উধাও; ১৫ জোড়া গরু–মহিষ, ধানের গোলা কিচ্ছু নাই’—এখনো দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন তিনি। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বিশাল জমিতে আমনের সময় ৫০০-৬০০ মণ ধান হতো তাঁদের, সেই জমিজমা সব পানিতে।

দুর্যোগের ধাক্কা থামে না মতলেবের জীবনে। আরও চারবার ঘরবাড়ি ভেঙেছে তাঁর। জমিজমা, সম্পত্তি যা কিছু ছিল, সব ছিনিয়ে নিয়েছে ঝড়, বন্যা আর নদীভাঙন। ঘরের ভিটা পর্যন্ত চলে গিয়েছিল; পরে চালিতাবুনিয়া বাজারের পশ্চিমে একখণ্ড জমি কিনে বাড়ি করে সেখানেই ছেলেদের সংসারে পড়ে আছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার এমন গল্প পটুয়াখালীর ঘরে ঘরে আছে। গত ৩ থেকে ৯ ডিসেম্বর জেলার বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে জলবায়ু যুদ্ধের মুখোমুখি হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে পটুয়াখালী এখন দেশের অন্যতম দরিদ্র জেলায় পরিণত হয়েছে।

২০১৯ সালে জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) বেসরকারি এক জরিপে দেখা যায়, পটুয়াখালীতে দরিদ্র খানার হার ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ। এর পরই রয়েছে কুড়িগ্রাম ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ এর আগের কয়েক বছর কুড়িগ্রামই ছিল দেশের দরিদ্রতম জেলা। নিপোর্ট, আইসিডিডিআরবি এবং মেজার ইভ্যালুয়েশন যৌথভাবে বাংলাদেশের সামাজিক জনমিতি ও স্বাস্থ্যসেবা সূচক নিয়ে ২০১৮ সালে এই জরিপ করে।

অবশ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সঙ্গে নিপোর্টের জরিপের ব্যবধান অনেক। বিবিএসের বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২ অনুসারে, পটুয়াখালীতে দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে নিপোর্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সূচকের ভিন্নতার কারণে বিবিএসের সঙ্গে নিপোর্টের জরিপের পার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক। বিবিএস মূলত জনশুমারির তথ্য বিশ্লেষণ করে খানা আয়–ব্যয়ের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে জরিপ করে থাকে। নিপোর্টের জরিপে জনশুমারির তথ্যের বাইরে পারিবারিক আয় ছাড়াও ঘরের অবস্থা, বিদ্যুৎ-সংযোগ, টয়লেটের ধরন, বাসার ধরন, টেলিভিশন ও মুঠোফোন আছে কি না, এসব বিষয় সূচক হিসেবে নেওয়া হয়।

মতলেব মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, আশপাশের দশ গ্রামে আমার মতো অনেক গেরস্ত ছিল, যাদের গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ, গোয়ালভরা গরু-মহিষ ছিল। একের পর এক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রায় সবাই নিঃস্ব হয়েছে। গেরস্তের বংশধরদের অবস্থা হয়েছে আরও খারাপ।

বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়ের তথ্যে দেখা গেছে, ১৫৫৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত এ দেশে অন্তত ৭০টি ঘূর্ণিঝড়ের অর্ধেকই সরাসরি আঘাত হেনেছে পটুয়াখালীতে। ২০০৭ সালে সিডরের পর থেকে সর্বশেষ ২০২৪ সাল পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখা যায়, এই দেড় যুগে আঘাতহানা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসগুলোতে পটুয়াখালীর হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, এক লাখের বেশি বাড়িঘর সম্পূর্ণ বা আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে, নষ্ট হয়েছে হাজার কোটি টাকার ফসল ও মাছ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ।

এসব সমস্যার মুখোমুখি হয়ে পটুয়াখালীর মানুষদের স্বাস্থ্যও এখন হুমকির মুখে। একশনএইড বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চলমান এক জরিপে দেখা গেছে, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ৪৫ শতাংশ মানুষ এখন গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগছেন। চর্মরোগ, ঘন ঘন জ্বর, ঠান্ডা ও সর্দিজনিত অসুখ, ডায়রিয়া, ডায়াবেটিস, ফুসকুড়ির মতো রোগ এখানকার বাসিন্দাদের নিত্যদিনের ঘটনা।

নদীভাঙনে নিঃস্ব

রাঙ্গাবালীর চর মোন্তাজ ইউনিয়নের প্রবেশমুখ থেকে ৫০০ মিটার এগিয়ে হাতের ডানে একটি ছোট মসজিদ, পাশে পুকুর। গত ৭ ডিসেম্বর সকালে পুকুরলাগোয়া ধানখেতে শুয়ে পড়া ধান কাটছিলেন নূরুল হাওলাদার (৬০)। দুই প্রয়াত বন্ধু খালেক হাওলাদার ও রশীদ খাঁর কথা স্মরণ করে নূরুল বললেন, ‘এলাকায় ধনসম্পদে আমরা তিন বন্ধু আগায়া ছিলাম। আমার নিজের ১০ কানি (১৬ একর) জমি দরিয়ায় লইয়া গ্যালো। তাও ভালো, ততদিনে পোলামাইয়াগুলা বড় অইয়া গ্যাছিলো। নাইলে হ্যাগোরে লইয়া পথে বওয়া লাগতো।’

চালিতাবুনিয়া দ্বীপের নজরুল ইসলামের (৪৫) গল্প আরও করুণ। পৈতৃক সূত্রে তাঁদের অন্তত ১০০ কানি (১৬০ একরের বেশি) জমি ছিল, নদীভাঙনে সব জমিই হারিয়েছে তাঁর পরিবার। এখন ১০ শতক জমি কিনে কোনোরকমে ঘর–সংসার টিকিয়ে রেখেছেন নজরুল।

পটুয়াখালীর ভেতরে–বাইরে মোট ৪২টি নদী বয়ে গেছে। এসব নদীর বেশির ভাগই প্রতিনিয়ত চাষাবাদযোগ্য জমিসহ ভিটেমাটি ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে জার্নাল অব সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড ইনফরমেশন ইনফরমেটিকস–এ প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ২০০২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে প্রায় এক হাজার একর চাষাবাদযোগ্য জমি, ২১০টি পরিবার, দুটি বাজার, তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১০টি মসজিদ পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

রাঙ্গাবালীর চর মোন্তাজের তেঁতুলিয়া নদী ঘেঁষে একমাত্র হিন্দুপাড়ায় এখন ১২০টি পরিবারের বাস। ১০–২০ হাত দূরে দূরে করা বাড়ির এই পাড়া আগে ছিল বনজঙ্গল। তাদের আদি পাড়া এখন তেঁতুলিয়া নদীর গর্ভে। এ পাড়ার মানুষের আকুতি— সরকার যেন একটা শক্তপোক্ত বেড়িবাঁধের ব্যবস্থা সেখানে করে, নাহলে এলাকাছাড়া হতে হবে তাঁদের।

গরমে মাঠে থাকা দায় কৃষকের

পটুয়াখালী জেলা আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে এ জেলায় গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য হারে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমেছে। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০২২ সালে গড়ে ৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। এই দুই সালের শুধু এপ্রিল মাসের বৃষ্টিপাতের পার্থক্য দেখা দিয়েছে ৩৫ মিলিমিটারের বেশি।

আবার আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গ্রীষ্মকালে তাপপ্রবাহ ছিল ১১৫ দিন। গ্রীষ্মের বাকি দিনগুলোর অধিকাংশ সময় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর।

এমন পরিস্থিতিতে গরমকালে কৃষকেরা মাঠে কাজ করতে পারেন না বলে জানান কুয়াকাটার চর কাউয়া চরের বাসিন্দা আলাউদ্দিন চৌকিদার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘মরিচ বা অন্যান্য খেতে যখন পানি দেওয়া লাগে, ওই সময়ে এমন গরম শুরু হয় যে ঘরেই থাকা যায় না। দিনের বেলায় মাঠে পা দেওয়া যায় না। মনে হয়, মাটির মধ্যে আগুন লাইগা রইছে। কাজকাম সব বন্ধ কইরা গাছের ছায়া খোঁজা লাগে, তা–ও যদি নিস্তার পাওয়া যাইতো!’

পেশা পরিবর্তন, চাপ বেড়েছে নদী–সাগরে

চালিতাবুনিয়ার আগুনমুখা নদীর পাড়ে বেল্লাল গাজীর (৫০) বাড়ি। গেরস্ত পরিবারের সন্তান বেল্লাল এখন অন্যের নৌকায় দিনমজুর খাটেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমগো বাড়িতে আগে কাজের লোক রাখা লাগত। দিন–রাত কাজ করত তারা!’

বেল্লাল গাজীর মতো কৃষকেরা এখন পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন। পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে পটুয়াখালীতে কৃষক পরিবার কমেছে প্রায় ৪০ হাজার বা ১৫ শতাংশ। আবার পেশা পরিবর্তন করা কৃষকদের বড় অংশ এখন জেলে হিসেবে নিজেদের পেশা বেছে নিয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়। রাঙ্গাবালীর আবদুল মালেক হাওলাদারের (৪৫) কথায় তার প্রতিফলনও দেখা গেছে। মালেক হাওলাদার বলেন, ‘আমার বাবা রুস্তম আলী হাওলাদার বড় গেরস্ত বংশের পোলা আছিল। সাত–আট বছর আগেও নিজের জমি থেকে ধান আসত। নদীতে সব হারায়ে এখন শুধু নামের লগে হাওলাদারই রইয়া গ্যাছে, কপালে হাওলাদার বংশের মর্যাদাটা নাই। এহন আমি অন্যের নৌকায় মাছ ধরি।’

জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৮–১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৩–২৪ পর্যন্ত ছয় বছরে সরকারি হিসাবে পটুয়াখালীতে ১০ হাজার জেলে বেড়েছে। সরকারের এই তালিকার বাইরেও অনেক জেলে আছেন। আগের তুলনায় জেলের সংখ্যা অনেক বেড়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, উপকূলীয় এই জেলার মানুষেরা ছোটবেলা থেকেই মাছ, জাল ও নৌকার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন, ফলে তাঁরা মাছ ধরায় পারদর্শী হন। কোনো উপায় না থাকলে তাঁরা নৌকা ও জাল নিয়ে নদী বা সাগরে মাছ ধরতে নেমে পড়েন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদী–সাগরে মাছ কমলেও জেলের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ফলে নদী ও সাগরে চাপ বেড়েছে।

দুঃখ বাড়ানো বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র

পটুয়াখালীতে পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে পুরোদমে উৎপাদন চলছে। এর বাইরে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর অধীন কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন। আশুগঞ্জ পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সুপার থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সেগুলোর মধ্যে একটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে কলাপাড়ার ধানখালী ও চম্পাপুর ইউনিয়নের ৯২৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে। পুরো এলাকাটিই নদীভাঙনপ্রবণ। এভাবে অন্যান্য তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণে অন্তত ৯ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করেছে সরকার।

গত ৯ ডিসেম্বর চম্পাপুরের ঠিক মাঝামাঝি বাংলাবাজার নামের ছোট বাজারে শিপন হাওলাদারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। তাঁর আড়াই একর জমির বেশির ভাগই অধিগ্রহণে নিয়েছে আশুগঞ্জ পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি। ক্ষতিপূরণ বাবদ পাওয়া টাকা ইতিমধ্যে নানা খাতে খরচ হয়েছে। এখন রুজি–রোজগারের ব্যবস্থা নেই।

প্রথম আলোকে শিপন হাওলাদার বলেন, ‘সব শেষ করে আধা কানি (৮০ শতক) জমি অবশিষ্ট আছে। জমিটা পাওয়ার প্ল্যান্টের (বিদ্যুৎকেন্দ্র) পাশে হওয়ায় আগের মতো ধান হয় না। দেখা যায়, গাছ কুঁকড়ায়ে গেছে বা ধানের শিষ ঠিকমতো বের হচ্ছে না। কয়টা কলাগাছ লাগাইছিলাম, কলার ছড়া বের হইছে কিন্তু কলা নাই।’

কই এলাকার দাদন হাওলাদার নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ায় ধোঁয়া ও গরমে নারকেলগাছ কালো হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ডাব হলুদ হয়ে যায়; নারকেল হওয়ার আগেই গাছ থেকে পড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আগে এমন হইতো না, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার পর দুই–তিন বছর ধরে এমন হইতেছে। গাছে আম–কাঁঠাল হয় না, ফলফলাদির গাছ লাগালে বাঁচে না। গরমকালে তো গরমের জন্য টেকাই যায় না; খেত–খামারে কাজ করার উপায় নাই।’

পায়রা সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষ কলাপাড়ার লালুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা জলিল সর্দারের (৫২) অন্তত পাঁচ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে। ক্ষতিপূরণের টাকায় চার ছেলের জন্য জমি কিনে বাড়ি বানিয়েছেন জলিল, চাষের জন্য সামান্য জমি রেখেছেন। জলিল সর্দার বলেন, ‘সব করে টাহা নাই একটাও হাতে। পোলাপানগোরে তো খাওন দিতে অইবে। বড় ছেলেটারে আটকায়ে রাখতে পারি নাই। সে (সাইফুল ইসলাম) নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটা গার্মেন্টসে কাজ করে। বিয়ে-থা করে বউ-বাচ্চাসহ সেখানেই তাঁর সংসার।’

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

একসঙ্গে মৃ*ত্যুর সিদ্ধান্ত, যমুনায় ঝাঁপ দিলেন প্রেমিক; শেষ মুহূর্তে সরে গেলেন প্রেমিকা…..see more

পটুয়াখালীর এক বাড়িতে শুরু হওয়া এই ধ’স্তাধ’স্তির নেপথ্যে বেরিয়ে এলো..

Update Time : 04:17 am, Thursday, 14 May 2026

বরিশাল বিভাগকে বলা হতো ‘বাংলার শস্যভান্ডার’ আর পটুয়াখালী তারই অংশ। জলবায়ু পরিবর্তন ধীরে ধীরে পটুয়াখালীকে দেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা বানিয়েছে; কিন্তু এখানেই শেষ নয়। পুরোনো প্রভাবের পাশাপাশি নতুন নতুন সমস্যার মুখে ফেলছে পটুয়াখালীর মানুষকে। ফলে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে জীবন-জীবিকা, ঝরে পড়ছে বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থী, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য। নারীরা পড়ছেন যৌনস্বাস্থ্যের জটিল সব সমস্যার মুখে। বাধ্য হয়ে জলবায়ু আর দারিদ্র্যের কাছে মানুষ অসহায় আত্মসমর্পণ করছে অথবা এলাকা ছাড়ছে।

ডিসেম্বরের হিম হিম সকাল। দোচালা টিনের ঘরের বারান্দায় কাঁথা-কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন এক বয়োজ্যেষ্ঠ। চরের সবাই তাঁকে একনামে চেনেন—মতলেব মল্লিক। প্রবীণ মতলেবের চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে শ্রম আর লড়াইয়ের চিহ্ন। একের পর এক ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করা মতলেবের চোখে ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় গোর্কির স্মৃতি এখনো ভয় ধরায়। তিনি বলেন, ‘সে কি ভয়ংকর ঝড়। কোথাও মাটি দ্যাহা যায় না; ঘরবাড়ি দ্যাহা যায় না। চারদিক পানি আর পানি।’

গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চালিতাবুনিয়ায় মতলেব মল্লিকের সঙ্গে কথা হয়। ’৭০–এর ঘূর্ণিঝড়ে নারকেলগাছের আগায় লটকে বেঁচে ছিলেন মতলেব; কিন্তু পরদিন বাড়ি ফিরে দেখেন—মা, স্ত্রী, এক ছেলে ছাড়া আর কিছু নেই। তিনি বলেন, ‘মাইয়াডা নাই, বোনডাও নাই, ঘরবাড়ি উধাও; ১৫ জোড়া গরু–মহিষ, ধানের গোলা কিচ্ছু নাই’—এখনো দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন তিনি। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বিশাল জমিতে আমনের সময় ৫০০-৬০০ মণ ধান হতো তাঁদের, সেই জমিজমা সব পানিতে।

দুর্যোগের ধাক্কা থামে না মতলেবের জীবনে। আরও চারবার ঘরবাড়ি ভেঙেছে তাঁর। জমিজমা, সম্পত্তি যা কিছু ছিল, সব ছিনিয়ে নিয়েছে ঝড়, বন্যা আর নদীভাঙন। ঘরের ভিটা পর্যন্ত চলে গিয়েছিল; পরে চালিতাবুনিয়া বাজারের পশ্চিমে একখণ্ড জমি কিনে বাড়ি করে সেখানেই ছেলেদের সংসারে পড়ে আছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার এমন গল্প পটুয়াখালীর ঘরে ঘরে আছে। গত ৩ থেকে ৯ ডিসেম্বর জেলার বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে জলবায়ু যুদ্ধের মুখোমুখি হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে পটুয়াখালী এখন দেশের অন্যতম দরিদ্র জেলায় পরিণত হয়েছে।

২০১৯ সালে জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) বেসরকারি এক জরিপে দেখা যায়, পটুয়াখালীতে দরিদ্র খানার হার ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ। এর পরই রয়েছে কুড়িগ্রাম ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ এর আগের কয়েক বছর কুড়িগ্রামই ছিল দেশের দরিদ্রতম জেলা। নিপোর্ট, আইসিডিডিআরবি এবং মেজার ইভ্যালুয়েশন যৌথভাবে বাংলাদেশের সামাজিক জনমিতি ও স্বাস্থ্যসেবা সূচক নিয়ে ২০১৮ সালে এই জরিপ করে।

অবশ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সঙ্গে নিপোর্টের জরিপের ব্যবধান অনেক। বিবিএসের বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২ অনুসারে, পটুয়াখালীতে দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে নিপোর্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সূচকের ভিন্নতার কারণে বিবিএসের সঙ্গে নিপোর্টের জরিপের পার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক। বিবিএস মূলত জনশুমারির তথ্য বিশ্লেষণ করে খানা আয়–ব্যয়ের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে জরিপ করে থাকে। নিপোর্টের জরিপে জনশুমারির তথ্যের বাইরে পারিবারিক আয় ছাড়াও ঘরের অবস্থা, বিদ্যুৎ-সংযোগ, টয়লেটের ধরন, বাসার ধরন, টেলিভিশন ও মুঠোফোন আছে কি না, এসব বিষয় সূচক হিসেবে নেওয়া হয়।

মতলেব মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, আশপাশের দশ গ্রামে আমার মতো অনেক গেরস্ত ছিল, যাদের গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ, গোয়ালভরা গরু-মহিষ ছিল। একের পর এক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রায় সবাই নিঃস্ব হয়েছে। গেরস্তের বংশধরদের অবস্থা হয়েছে আরও খারাপ।

বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়ের তথ্যে দেখা গেছে, ১৫৫৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত এ দেশে অন্তত ৭০টি ঘূর্ণিঝড়ের অর্ধেকই সরাসরি আঘাত হেনেছে পটুয়াখালীতে। ২০০৭ সালে সিডরের পর থেকে সর্বশেষ ২০২৪ সাল পর্যন্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে দেখা যায়, এই দেড় যুগে আঘাতহানা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসগুলোতে পটুয়াখালীর হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, এক লাখের বেশি বাড়িঘর সম্পূর্ণ বা আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে, নষ্ট হয়েছে হাজার কোটি টাকার ফসল ও মাছ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ।

এসব সমস্যার মুখোমুখি হয়ে পটুয়াখালীর মানুষদের স্বাস্থ্যও এখন হুমকির মুখে। একশনএইড বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চলমান এক জরিপে দেখা গেছে, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ৪৫ শতাংশ মানুষ এখন গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগছেন। চর্মরোগ, ঘন ঘন জ্বর, ঠান্ডা ও সর্দিজনিত অসুখ, ডায়রিয়া, ডায়াবেটিস, ফুসকুড়ির মতো রোগ এখানকার বাসিন্দাদের নিত্যদিনের ঘটনা।

নদীভাঙনে নিঃস্ব

রাঙ্গাবালীর চর মোন্তাজ ইউনিয়নের প্রবেশমুখ থেকে ৫০০ মিটার এগিয়ে হাতের ডানে একটি ছোট মসজিদ, পাশে পুকুর। গত ৭ ডিসেম্বর সকালে পুকুরলাগোয়া ধানখেতে শুয়ে পড়া ধান কাটছিলেন নূরুল হাওলাদার (৬০)। দুই প্রয়াত বন্ধু খালেক হাওলাদার ও রশীদ খাঁর কথা স্মরণ করে নূরুল বললেন, ‘এলাকায় ধনসম্পদে আমরা তিন বন্ধু আগায়া ছিলাম। আমার নিজের ১০ কানি (১৬ একর) জমি দরিয়ায় লইয়া গ্যালো। তাও ভালো, ততদিনে পোলামাইয়াগুলা বড় অইয়া গ্যাছিলো। নাইলে হ্যাগোরে লইয়া পথে বওয়া লাগতো।’

চালিতাবুনিয়া দ্বীপের নজরুল ইসলামের (৪৫) গল্প আরও করুণ। পৈতৃক সূত্রে তাঁদের অন্তত ১০০ কানি (১৬০ একরের বেশি) জমি ছিল, নদীভাঙনে সব জমিই হারিয়েছে তাঁর পরিবার। এখন ১০ শতক জমি কিনে কোনোরকমে ঘর–সংসার টিকিয়ে রেখেছেন নজরুল।

পটুয়াখালীর ভেতরে–বাইরে মোট ৪২টি নদী বয়ে গেছে। এসব নদীর বেশির ভাগই প্রতিনিয়ত চাষাবাদযোগ্য জমিসহ ভিটেমাটি ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে জার্নাল অব সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড ইনফরমেশন ইনফরমেটিকস–এ প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ২০০২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে প্রায় এক হাজার একর চাষাবাদযোগ্য জমি, ২১০টি পরিবার, দুটি বাজার, তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ১০টি মসজিদ পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

রাঙ্গাবালীর চর মোন্তাজের তেঁতুলিয়া নদী ঘেঁষে একমাত্র হিন্দুপাড়ায় এখন ১২০টি পরিবারের বাস। ১০–২০ হাত দূরে দূরে করা বাড়ির এই পাড়া আগে ছিল বনজঙ্গল। তাদের আদি পাড়া এখন তেঁতুলিয়া নদীর গর্ভে। এ পাড়ার মানুষের আকুতি— সরকার যেন একটা শক্তপোক্ত বেড়িবাঁধের ব্যবস্থা সেখানে করে, নাহলে এলাকাছাড়া হতে হবে তাঁদের।

গরমে মাঠে থাকা দায় কৃষকের

পটুয়াখালী জেলা আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে এ জেলায় গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য হারে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমেছে। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০২২ সালে গড়ে ৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। এই দুই সালের শুধু এপ্রিল মাসের বৃষ্টিপাতের পার্থক্য দেখা দিয়েছে ৩৫ মিলিমিটারের বেশি।

আবার আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গ্রীষ্মকালে তাপপ্রবাহ ছিল ১১৫ দিন। গ্রীষ্মের বাকি দিনগুলোর অধিকাংশ সময় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর।

এমন পরিস্থিতিতে গরমকালে কৃষকেরা মাঠে কাজ করতে পারেন না বলে জানান কুয়াকাটার চর কাউয়া চরের বাসিন্দা আলাউদ্দিন চৌকিদার। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘মরিচ বা অন্যান্য খেতে যখন পানি দেওয়া লাগে, ওই সময়ে এমন গরম শুরু হয় যে ঘরেই থাকা যায় না। দিনের বেলায় মাঠে পা দেওয়া যায় না। মনে হয়, মাটির মধ্যে আগুন লাইগা রইছে। কাজকাম সব বন্ধ কইরা গাছের ছায়া খোঁজা লাগে, তা–ও যদি নিস্তার পাওয়া যাইতো!’

পেশা পরিবর্তন, চাপ বেড়েছে নদী–সাগরে

চালিতাবুনিয়ার আগুনমুখা নদীর পাড়ে বেল্লাল গাজীর (৫০) বাড়ি। গেরস্ত পরিবারের সন্তান বেল্লাল এখন অন্যের নৌকায় দিনমজুর খাটেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমগো বাড়িতে আগে কাজের লোক রাখা লাগত। দিন–রাত কাজ করত তারা!’

বেল্লাল গাজীর মতো কৃষকেরা এখন পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন। পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে পটুয়াখালীতে কৃষক পরিবার কমেছে প্রায় ৪০ হাজার বা ১৫ শতাংশ। আবার পেশা পরিবর্তন করা কৃষকদের বড় অংশ এখন জেলে হিসেবে নিজেদের পেশা বেছে নিয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়। রাঙ্গাবালীর আবদুল মালেক হাওলাদারের (৪৫) কথায় তার প্রতিফলনও দেখা গেছে। মালেক হাওলাদার বলেন, ‘আমার বাবা রুস্তম আলী হাওলাদার বড় গেরস্ত বংশের পোলা আছিল। সাত–আট বছর আগেও নিজের জমি থেকে ধান আসত। নদীতে সব হারায়ে এখন শুধু নামের লগে হাওলাদারই রইয়া গ্যাছে, কপালে হাওলাদার বংশের মর্যাদাটা নাই। এহন আমি অন্যের নৌকায় মাছ ধরি।’

জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৮–১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৩–২৪ পর্যন্ত ছয় বছরে সরকারি হিসাবে পটুয়াখালীতে ১০ হাজার জেলে বেড়েছে। সরকারের এই তালিকার বাইরেও অনেক জেলে আছেন। আগের তুলনায় জেলের সংখ্যা অনেক বেড়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, উপকূলীয় এই জেলার মানুষেরা ছোটবেলা থেকেই মাছ, জাল ও নৌকার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন, ফলে তাঁরা মাছ ধরায় পারদর্শী হন। কোনো উপায় না থাকলে তাঁরা নৌকা ও জাল নিয়ে নদী বা সাগরে মাছ ধরতে নেমে পড়েন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদী–সাগরে মাছ কমলেও জেলের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ফলে নদী ও সাগরে চাপ বেড়েছে।

দুঃখ বাড়ানো বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র

পটুয়াখালীতে পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে পুরোদমে উৎপাদন চলছে। এর বাইরে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর অধীন কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন। আশুগঞ্জ পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সুপার থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সেগুলোর মধ্যে একটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে কলাপাড়ার ধানখালী ও চম্পাপুর ইউনিয়নের ৯২৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে। পুরো এলাকাটিই নদীভাঙনপ্রবণ। এভাবে অন্যান্য তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণে অন্তত ৯ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করেছে সরকার।

গত ৯ ডিসেম্বর চম্পাপুরের ঠিক মাঝামাঝি বাংলাবাজার নামের ছোট বাজারে শিপন হাওলাদারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। তাঁর আড়াই একর জমির বেশির ভাগই অধিগ্রহণে নিয়েছে আশুগঞ্জ পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি। ক্ষতিপূরণ বাবদ পাওয়া টাকা ইতিমধ্যে নানা খাতে খরচ হয়েছে। এখন রুজি–রোজগারের ব্যবস্থা নেই।

প্রথম আলোকে শিপন হাওলাদার বলেন, ‘সব শেষ করে আধা কানি (৮০ শতক) জমি অবশিষ্ট আছে। জমিটা পাওয়ার প্ল্যান্টের (বিদ্যুৎকেন্দ্র) পাশে হওয়ায় আগের মতো ধান হয় না। দেখা যায়, গাছ কুঁকড়ায়ে গেছে বা ধানের শিষ ঠিকমতো বের হচ্ছে না। কয়টা কলাগাছ লাগাইছিলাম, কলার ছড়া বের হইছে কিন্তু কলা নাই।’

কই এলাকার দাদন হাওলাদার নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ায় ধোঁয়া ও গরমে নারকেলগাছ কালো হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ডাব হলুদ হয়ে যায়; নারকেল হওয়ার আগেই গাছ থেকে পড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আগে এমন হইতো না, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার পর দুই–তিন বছর ধরে এমন হইতেছে। গাছে আম–কাঁঠাল হয় না, ফলফলাদির গাছ লাগালে বাঁচে না। গরমকালে তো গরমের জন্য টেকাই যায় না; খেত–খামারে কাজ করার উপায় নাই।’

পায়রা সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষ কলাপাড়ার লালুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা জলিল সর্দারের (৫২) অন্তত পাঁচ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে। ক্ষতিপূরণের টাকায় চার ছেলের জন্য জমি কিনে বাড়ি বানিয়েছেন জলিল, চাষের জন্য সামান্য জমি রেখেছেন। জলিল সর্দার বলেন, ‘সব করে টাহা নাই একটাও হাতে। পোলাপানগোরে তো খাওন দিতে অইবে। বড় ছেলেটারে আটকায়ে রাখতে পারি নাই। সে (সাইফুল ইসলাম) নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটা গার্মেন্টসে কাজ করে। বিয়ে-থা করে বউ-বাচ্চাসহ সেখানেই তাঁর সংসার।’