গুদামে হাজার হাজার টন সার মজুত থাকার পরও মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ার অভিযোগে রাজশাহীতে ক্ষোভ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী জেলায় ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারের দোকানে দিনের পর দিন ঘুরেও তারা নির্ধারিত দামে প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—সরকারি গুদামে যদি পর্যাপ্ত সার থাকে, তাহলে কৃষকের হাতে সেই সার পৌঁছাচ্ছে না কেন?
সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় সার কেনার জন্য কৃষকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও খালি হাতে বাড়ি ফিরছেন বলে অভিযোগ করেছেন। আবার একই এলাকায় বেশি দামে খুচরা বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে—এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন কৃষক। ফলে সরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও মাঠে সংকটের চিত্র কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি গুদামে মজুত কত?
রাজশাহী বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর নওদাপাড়া এলাকায় বিএডিসির গুদামসহ সরকারি বিভিন্ন গুদামে বিপুল পরিমাণ সার মজুত রয়েছে। বিসিআইসির বাফার গুদামে প্রায় ৯ হাজার ৮০৪ টন ইউরিয়া, ৪৩০ টন টিএসপি ও ৮৫ টন ডিএপি মজুত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে বিএডিসির গুদামে রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৩১২ টন টিএসপি, ৮০১ টন এমওপি এবং ৪ হাজার ৩৪৮ টন ডিএপি। অর্থাৎ সরকারি পর্যায়ের মজুত বিবেচনায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সারঘাটতির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রশাসনের তথ্যে আরও বলা হয়েছে, শুধু টিএসপির মজুতই চলতি মাসের বরাদ্দের কয়েকগুণ বেশি। একইভাবে ইউরিয়ার মজুতও মাসিক বরাদ্দের তুলনায় উল্লেখযোগ্য। তাহলে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে সার নিয়ে এমন হাহাকার কেন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন নজর দিতে হচ্ছে সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে।
ডিলারের গুদামে মিলল বিপুল সার
সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুতের মধ্যেই রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় ডিলারের গুদামে বিপুল পরিমাণ সার মজুতের ঘটনা সামনে এসেছে।
সম্প্রতি পুঠিয়া উপজেলার কার্তিকপাড়া বাজারে অভিযান চালিয়ে ৩৩০ বস্তা সার জব্দ করে উপজেলা প্রশাসন। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি এবং অননুমোদিতভাবে মজুতের অভিযোগে এ অভিযান চালানো হয়।
এর আগে গোদাগাড়ীতেও একটি ডিলারের গুদামে অভিযান চালিয়ে ৮১৭ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ৬১৬ বস্তা এমওপি ও ২০১ বস্তা টিএসপি ছিল। কৃষকদের প্রয়োজনের সময়ে সার বিক্রি না করে বিপুল পরিমাণ সার গুদামে মজুত করে রাখার অভিযোগের পর অভিযানটি চালানো হয়।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সার ডিলারকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে ডিলারদের গুদাম ও বিক্রয়কেন্দ্রে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, বেশি দামে সার মিলছে
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত দামে ডিলারের কাছ থেকে সার পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন দোকানে ঘুরেও সার না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। অথচ বেশি টাকা দিলে অন্য জায়গায় সার পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এক কৃষকের ভাষ্য, কয়েক দিন ধরে বাজারে ঘুরেও ডিলারের কাছ থেকে সার পাননি। অথচ বেশি টাকা দিলে খুচরা বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে। আরেক কৃষকের অভিযোগ, ভোরে লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পেয়ে তাকে ফিরে আসতে হয়েছে।
কৃষকদের আশঙ্কা, ধানের জমিতে নির্দিষ্ট সময়ে সার প্রয়োগ করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। ফলে বাজারে সার থাকা সত্ত্বেও যদি তা কৃষকের হাতে সময়মতো না পৌঁছায়, তাহলে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয়ে।
প্রশাসন বলছে, সার সংকট নেই
তবে কৃষকদের অভিযোগের বিপরীতে প্রশাসনের বক্তব্য ভিন্ন। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার জানিয়েছেন, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী নিয়মিতভাবে ডিলারদের কাছে সার সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, ইউরিয়ার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং বরাদ্দ ও উত্তোলনের প্রক্রিয়া চলমান। জেলার সার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
তাহলে সরকারি হিসাব এবং মাঠের বাস্তবতার মধ্যে এত বড় পার্থক্য কেন—এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কোথায় তৈরি হচ্ছে সমস্যা?
সরকারি গুদাম থেকে ডিলারের গুদাম পর্যন্ত সার পৌঁছানোর পর সেটি কীভাবে